Banglarnetro
Dr. Neem Hakim

সহজ হওয়ার সাধনায় : আমার কথা-এনামূল হক পলাশ


বাংলার নেত্র প্রকাশের সময় : জুন ২৬, ২০২৬, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ / ৪১
সহজ হওয়ার সাধনায় : আমার কথা-এনামূল হক পলাশ

আমার জন্ম ১৯৭৭ সালের ২৬ জুন, নেত্রকোণা জেলার বারহাট্টা উপজেলার বাদে চিরাম গ্রামে, আমার মাতুলালয়ে। পৈত্রিক নিবাস একই উপজেলার বামনগাঁও গ্রামে। পিতা মরহুম এমদাদুল হক এবং মাতা নুরুন্নাহার হকের সন্তানদের মধ্যে আমি সবার বড়। শৈশবের প্রথম দিনগুলো কেটেছে গ্রামে, কিন্তু পিতার ব্যবসার কারণে বেড়ে উঠেছি গোপালপুর বাজার ও বারহাট্টা শহরের পরিবেশে। সেই ছোটবেলাতেই বইয়ের প্রতি এক অদম্য আকর্ষণ জন্মেছিল, যা পরবর্তীতে আমার জীবনকে নির্ধারণ করেছে।

বারহাট্টা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করি ট্যালেন্টপুল বৃত্তি নিয়ে। পরে বারহাট্টা সি.কে.পি. পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সাধারণ বৃত্তি ও ড. ইন্নাছ আলী বৃত্তি লাভ করি। বিদ্যালয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল বারহাট্টা পাবলিক লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠা। একজন নিয়মিত পাঠক হিসেবে সেই লাইব্রেরিই হয়ে ওঠে আমার প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়। বইয়ের সঙ্গে আমার আজীবনের বন্ধুত্বের সূচনা সেখানেই।

১৯৯৫ সালে ‘মাটির সুবাস’ পত্রিকায় আমার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। কবিতার জন্য ডাকযোগে চল্লিশ টাকার সম্মানী পেয়েছিলাম। খরচ বাদে হাতে এসেছিল সাতত্রিশ টাকা পঁচিশ পয়সা। অর্থের অঙ্কটি ছোট ছিল, কিন্তু একজন তরুণ কবির কাছে সেটি ছিল স্বপ্নপূরণের প্রথম স্বীকৃতি।

 

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে ঢাকায় আসি। সরকারি তিতুমীর কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞানে অনার্সে ভর্তি হই। কিন্তু পারিবারিক আর্থিক সংকট আমাকে আবার ফিরিয়ে আনে মাটির কাছে, মানুষের কাছে। নেত্রকোণা সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক এবং গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করি।

 

নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে প্রগতিশীল বামপন্থী রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা তৈরি হয়। রাজনীতি, দর্শন, ইতিহাস ও সমাজচিন্তা নিয়ে গভীর পাঠ ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে আমার বোধের জগৎ প্রসারিত হয়। একই সময়ে সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলাম। জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছি। মানুষের জীবন, সংগ্রাম, বঞ্চনা এবং স্বপ্নকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি।

 

২০০৩ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দিই। ভূমি প্রশাসনের কঠিন ও ব্যস্ত কর্মজীবনের ভেতরেও লেখালেখি থেমে থাকেনি। বরং মানুষের জমি, জীবন, দ্বন্দ্ব, সম্পর্ক এবং বাস্তবতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় আমার সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

 

আমার জীবনের কিছু অধ্যায় গভীর বেদনার। ২০০৬ সালে মৃত কন্যাসন্তানের জন্ম এবং নিজের হাতে তাকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা, ২০০৭ সালে পিতার মৃত্যু—এই ঘটনাগুলো আমার ভেতরের মানুষটিকে বদলে দিয়েছে। জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। বুঝিয়েছিল, মানুষ আসলে স্মৃতি, বেদনা ও ভালোবাসার সমন্বয়ে নির্মিত এক অনন্ত যাত্রী।

 

২০০৯ সালে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অস্তিত্বের জন্য যুদ্ধ চাই’ প্রকাশিত হয়। এরপর একে একে প্রকাশিত হয়েছে ‘জীবন এক মায়াবী ভ্রমণ’, ‘অন্ধ সময়ের ডানা’, ‘অন্তরাশ্রম’, ‘মেঘের সন্ন্যাস’, ‘পাপের শহরে’, ‘জল ও হিজল’, ‘তামাশা বাতাসে পৃথিবী’, ‘অখণ্ড জীবনের পাঠ’, ‘লাবণ্য দাশ এন্ড কোং’, ‘সুফি কবিতা’, ‘পলায়নের আগে’সহ বহু কাব্যগ্রন্থ, শিশুতোষ গ্রন্থ, অনুবাদ ও প্রবন্ধের বই। আরবি, তুর্কি, ফিলিস্তিনি ও বিশ্বসাহিত্যের নানা গুরুত্বপূর্ণ রচনা বাংলায় অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি, কারণ আমি বিশ্বাস করি—ভাষার সীমানা ভেঙে মানুষকে মানুষের সঙ্গে যুক্ত করাই সাহিত্যিকের অন্যতম দায়িত্ব।

 

২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠা করি ‘অন্তরাশ্রম’। এটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি আমার স্বপ্ন, দর্শন ও মানবিক চর্চার এক আশ্রয়ভূমি। আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবীকে বদলানোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সংস্কৃতি, ভালোবাসা এবং মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা।

 

আমার সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সমাজ, পরিবেশ ও সংস্কৃতি নিয়ে নানা উদ্যোগে যুক্ত থাকার সুযোগ হয়েছে। কবিতাকুঞ্জের অবকাঠামো নির্মাণে অংশগ্রহণ, ভূমি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ধারণা প্রদান, বাউল কবি রশিদ উদ্দিনের ভাস্কর্য নির্মাণ, সাংস্কৃতিক সংগঠন পরিচালনা—এসবই আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

 

সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা আমাকে কখনো নিরপেক্ষ দর্শক হয়ে থাকতে দেয়নি। অন্যায়, বৈষম্য, নিপীড়ন ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমি লিখেছি, কথা বলেছি, অবস্থান নিয়েছি। আমার কাছে কবিতা কেবল শব্দের শিল্প নয়; এটি মানুষের মুক্তি, প্রতিবাদ, প্রেম ও স্বপ্নের ভাষা।

 

আজও আমি লিখে চলেছি। ছাদবাগানে শাপলা, পদ্ম, দোলনচাঁপা ফুটাই। পাখি, গাছ, ফুল, মানুষ—সবকিছুর মধ্যে আমি জীবনের এক গভীর ঐক্য অনুভব করি। আমি মনে করি, পৃথিবীকে বদলানোর আগে মানুষকে নিজের ভেতরটাকে সুন্দর করতে হয়।

 

জীবনের এত পথ পেরিয়ে এসে আমার উপলব্ধি একটাই—আমি সাধু নই, সাধু হতেও চাই না। আমি শুধু সহজ হতে চাই। সহজের সাধনাই আমার জীবন, আমার কবিতা, আমার অন্তরাশ্রম।

 

 

কার্ড কাস্টমাইজ করুন

কার্ড ব্যাকগ্রাউন্ড
বর্ডার কালার
শিরোনাম রঙ
সাইজ: 70px
Version 3.2 | Developed by Shahin

সাহিত্য বিভাগের আরো খবর

আরও খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর