
বিশেষ প্রতিনিধি.
চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে গ্রামীণ সংস্কৃতি ও কৃষিতে খনার বচনের তাৎপর্য তুলে ধরতে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে তৃতীয়তম খনার মেলা। সোমবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে উপজেলার আঙ্গারোয়া গ্রামে স্থানীয় কৃষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহণে মেলার উদ্বোধন করা হয়।
স্থানীয় সংগঠন মঙ্গলঘর পরিসরের আয়োজনে দিনব্যাপী এ মেলায় কথা, গান ও বিভিন্ন পরিবেশনার মধ্য দিয়ে খনার বচন তুলে ধরা হয়। আগামীকাল মঙ্গলবার পয়লা বৈশাখের সূর্যোদয়ের সঙ্গে মেলার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। এলাকাবাসী ও ‘কুল এক্সপোজার’ যৌথভাবে এ আয়োজন করেছে।
সকাল থেকেই মেলায় পালাগান, কবিতা, বাউলগান ও কিচ্ছাপালা পরিবেশিত হয়। পাশাপাশি রয়েছে ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ প্রদর্শনী, লণ্ঠন উৎসব এবং ‘ভোরের হাওয়া’ নামে একটি স্মারকের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। সংগীত, শ্লোক ও আলোচনা পর্বে খনার কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীবনবোধ নিয়ে বিশদ আলাপ হয়।
সোমবার বিকেলে লোকসংগীতশিল্পী কফিল আহমেদের পরিবেশনায় লোকগান ও পুঁথিপাঠের আসর বসে। এছাড়া সংগীত পরিবেশন করে সমগীত, সহজিয়া, চিৎকার ও কৃষ্ণকলি দল।
মেলায় দেশি-বিদেশি শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের অংশগ্রহণ লক্ষ করা গেছে। প্রদর্শনীতে রয়েছে কুলা, পাইল্লা, ধুচনি, দাঁড়িপাল্লা, ধারি, মাটির কলস, মটকি, সানকি এবং পাটজাত বিভিন্ন শিল্পকর্ম। কৃষকেরা নিজেদের মধ্যে দেশি বীজ বিনিময় করেছেন।
পরিবেশ সচেতনতার অংশ হিসেবে মেলা প্রাঙ্গণে প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। তবে, বসার জন্য প্লাস্টিকের চেয়ার ছিল।
সকালের আলোচনা পর্বে ‘জল ভালা ভাসা, মানুষ ভালা চাষা’ শীর্ষক বিষয়ে বক্তব্য দেন লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, প্রাকৃতিক কৃষি আন্দোলনের সংগঠক দেলোয়ার জাহান, কবি আহমেদ নকিব, লেখক বাকি বিল্লাহ, সংস্কৃতিকর্মী বীথি ঘোষ, কবি আসমা বীথি, আবুল কালাম আল আজাদ, লোকসাহিত্য গবেষক রাখাল বিশ্বাস এবং আয়োজক বদরুন নূর চৌধুরী।
মেলায় অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা মনোরঞ্জন সরকার বলেন, খনার বচনের মাধ্যমে সমাজের নানা অসংগতি ও কৃষিজীবনের বাস্তবতা উঠে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়ও তিনি বহু আগে ইঙ্গিত করেছেন।

কলমাকান্দা উপজেলার শিক্ষক পল্লব চক্রবর্তী বলেন, খনার বচনে মানুষের জীবন, খাদ্যাভ্যাস ও আবহাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উঠে আসে। এ ধরনের আয়োজন আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। মেলায় এসে খনার বচনের মাধ্যমে কৃষি সম্পর্কে নতুন ধারণা পেয়েছেন। তিনি মনে করেন, এসব জ্ঞান কৃষকদের জন্য উপকারী।
সংগঠক আবুল কালাম আজাদ বলেন, দুই বছর আগে আঙ্গারোয়া গ্রামে এ মেলার সূচনা হয়। খনার বচনের মাধ্যমে লোকায়ত বাংলার জীবন, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসকে তুলে ধরাই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
ভারত থেকে আগত সংগীতশিল্পী মৌসুমী ভৌমিক বলেন, খনা কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং তিনি এক ধরনের প্রতীক। যিনি যুগ যুগ ধরে মানুষের জীবনের বাস্তবতা ও প্রতিবাদের ভাষা হয়ে আছেন।
আপনার মতামত লিখুন :