Banglarnetro
Dr. Neem Hakim

আশুড়া হউক জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের ঐক্যের প্রতীক- এনামূল হক পলাশ


বাংলার নেত্র প্রকাশের সময় : জুলাই ৬, ২০২৫, ২:৪৩ অপরাহ্ণ / ৬২৮
আশুড়া হউক জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের ঐক্যের প্রতীক- এনামূল হক পলাশ

মুসলিম ধর্মের লোকদের জন্য আশুড়া একটি ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবস। মহররম মাসের দশম দিনকে আশুরা বলা হয়। এটি ইসলাম ধর্ম অনুসারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। সুন্নি মতানুযায়ী ইহুদীরা মুছা আ. এর বিজয়ের স্মরণে আশুরার সওম পালন করত। তবে শিয়া মত এ ইতিহাসকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তারা আশুরাকে কারবালার বিষাদময় ঘটনার স্মরণে পালন করে। কিন্তু ইসলামের ইতিহাস অনুসারে এই দিনটি বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এই দিনটি একটি পবিত্র দিন কেননা ১০ মুহররম তারিখে আসমান ও যমিন সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই দিনে পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই দিনে আল্লাহ নবীদেরকে স্ব স্ব শত্রুর হাত থেকে আশ্রয় প্রদান করেছেন। এই দিন নবী হযরত মুসা (আঃ) এর শত্রু ফেরাউনকে নীল নদে ডুবিয়ে দেয়া হয়। নুহ (আঃ) এর কিস্তি ঝড়ের কবল হতে রক্ষা পেয়েছিলো এবং তিনি জুডি পর্বতশৃংগে নোঙ্গর ফেলেছিলেন। এই দিনে দাউদ (আঃ) এর তওবা কবুল হয়েছিলো, নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) উদ্ধার পেয়েছিলেন; হযরত আইয়ুব (আঃ) দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত ও সুস্থতা লাভ করেছিলেন; এদিনে আল্লাহ তা’আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে ঊর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন। হাদিসে বর্ণিত আছে যে এই তারিখেই কেয়ামত সংঘটিত হবে।

৬৮০ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে মুয়াবিয়ার পুত্র ইয়াজিদ নিজেকে খলিফা ঘোষণা করে। ইয়াজিদ মদিনার গর্ভনরকে তাৎক্ষণিকভাবে মাওলা হুসাইন ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আনুগত্য (বায়াত) আদায়ের জন্য নিদের্শ দেয়। কিন্তু মাওলা হুসাইন ইবনে আলী তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ, তিনি মনে করতেন যে, ইয়াজিদ ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে দূরে সরে গেছে এবং মুহাম্মদ সা. এর সুন্নাহকে পরিবর্তন করছে। অতঃপর মাওলা হুসাইন ইবনে আলী তাঁর পরিবারের সদস্য, সন্তান, ভাই এবং মাওলা হাসানের পুত্রদের নিয়ে মদিনা থেকে মক্কায় চলে যান।

অপরদিকে কুফাবাসী যারা মুয়াবিয়ার মৃত্যু সম্পর্কে অবগত ছিল তারা চিঠির মাধ্যমে তাঁদের সাথে যোগ দেওয়ার জন্য ইমাম হুসাইনকে অনুরোধ করেন এবং উমাইয়াদের বিপক্ষে তাঁকে সমর্থন প্রদান করেন। প্রত্যুত্তরে ইমাম হুসাইন চিঠির মাধ্যমে জানান যে অবস্থা পর্যবেক্ষনের জন্য তিনি মুসলিম ইবনে আকীল কে পাঠাবেন। যদি তিনি তাদের ঐক্যবদ্ধ দেখতে পান যেভাবে চিঠিতে বর্ণিত হয়েছে সেরুপ তবে খুবই দ্রুতই যোগ দিবেন, কারণ একজন ইমামের দায়িত্ব হচ্ছে কুরআন বর্ণিত অনুসারে কাজের আঞ্জাম দেওয়া, ন্যায়বিচার সমুন্নত করা, সত্য প্রতিষ্ঠিত করা এবং নিজেকে স্রষ্টার নিকট সঁপে দেওয়া। মুসলিম ইবনে আকীলের প্রাথমিক মিশন খুবই সফল ছিল এবং ১৮০০ এর অধিক ব্যক্তি বায়াত নিয়েছিল বা শপথ প্রদান করেছিল। কিন্তু অবস্থা ইতিমধ্যে পরিবর্তন হয়ে যায়। উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদ কুফার নতুন গভর্নর হিসেবে যোগ দেয় এবং মুসলিম ইবনে আকীলকে হত্যার নির্দেশ জারি করে। আকীলের মৃত্যু খবর পৌঁছার আগেই ইমাম হুসাইন ইবনে আলী কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা আরম্ভ করে দেন। পথিমধ্যে ইমাম হুসাইন খবর পান যে আকীলকে কুফায় হত্যা করা হয়েছে। তিনি খবরটি তাঁর সমর্থকদের জানালেন এবং তাদের বললেন যে জনগণ তাঁর সাথে প্রতারণা করেছে। তিনি কোন সংশয় ছাড়াই তাঁর সাথীদের তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে বললেন। নিকটাত্মীয়রা ছাড়া অধিকাংশ সঙ্গী তাঁকে ছেড়ে চলে যায়। যাই হোক কুফার যাত্রাপথে উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের সাথে ইমাম হুসাইনকে মোকাবেলা করতে হয়। কুফাবাসীগণ ইমামবিহীন থাকার কারণে হুসাইনকে আমন্ত্রণ করেছিল সে প্রতিশ্রুতির কথা কুফার সেনাবাহিনীকে স্মরণ করতে বললেন। তিনি বললেন যে, কুফাবাসী সমর্থন করেছিলো বলেই তিনি যাত্রা করেছেন। কিন্তু তারা যদি ইমাম হুসাইনের আগমনকে অপছন্দ করে তবে তিনি যেখান থেকে এসেছেন সেখানে চলে যাবেন। তবে সেনাবাহিনী ইমাম হুসাইনকে অন্য পথ অবলম্বন করতে বলল। এতে করে, ইমাম হুসাইন বাম দিকে যাত্রা করলেন এবং কারবালায় পৌঁছে গেলেন। সেনাবাহিনী ইমাম হুসাইনকে এমন এক জায়গায় অবস্থান নিতে বাধ্য করল যে জায়গাটি ছিল পানিশূন্য।

সেনাপ্রধান উমার ইবনে সাদ ইমাম হুসাইনের আগমনের উদ্দেশ্য বুঝার জন্য দূত প্রেরণ করলেন। ইমাম হুসাইন জানালেন যে তিনি কুফাবাসীর আমন্ত্রণে এসেছেন কিন্তু তারা যদি অপছন্দ করে তবে তিনি ফিরে যেতে প্রস্তুত রয়েছেন। যখন এই প্রতিবেদন ইবনে জিয়াদের কাছে পৌছল তখন সে সাদকে ইমাম হুসাইন ও তাঁর সমর্থকদের ইয়াজিদের প্রতি বায়াত নেওয়ার নির্দেশ দিল। সে এও নির্দেশ দিল যে, হুসাইন ও তাঁর সঙ্গীরা যাতে কোন পানি না পায়। পরের দিন সকালে উমার বিন সাদ তার সেনাবাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বলল। আল হুর ইবনে ইয়াজিদ আল তামিম সাদের দল ত্যাগ করে হুসাইনের সাথে যোগ দিলেন। তিনি কুফাবাসীদের বুঝাতে ব্যর্থ হয়ে নবী সা. এর নাতীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য ভৎসর্ণা করলেন। অতঃপর যুদ্ধে তিনি নিহত হন।

কারবালার যুদ্ধ সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। দিনটি ছিল ১০ ই অক্টোবর ৬৮০ খ্রিস্টাব্দ (মুহাররম ১০, ৬১ হিজরি) এই যুদ্ধে প্রায় ৭২ জন নিহত হন যাদের সকলেই পানি বঞ্চনার শিকার হন। অর্থাৎ সকল পুরুষ সদস্যই নিহত হন কেবলমাত্র রোগা ও দুর্বল জয়নুল আবেদিন ছাড়া।
এটি এক অসম যুদ্ধ ছিল। যেখানে হুসাইন ও তাঁর পরিবার বিশাল এক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আবু রায়হান আল বিন্নী এর মতে, “তাবুগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং মৃতদেহগুলোকে ঘোড়ার খুড় দ্বারা ক্ষতবিক্ষত ও পদদলিত করা হয়; মানব ইতিহাসে কেউ এমন নৃশংসতা দেখেনি। হত্যার আগমুহূর্তে হুসাইন বলেন, ” আমার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যদি মুহাম্মদের দ্বীন জীবন্ত হয়, তবে আমাকে তরবারি দ্বারা টুকরো টুকরো করে ফেল।”
উমাইয়া সৈন্যরা ইমাম হুসাইন ও তাঁর পুরুষ সঙ্গীদের হত্যা করার পর সম্পদ লুট করে, মহিলাদের গয়না কেড়ে নেয়। শিমার জয়নাল আবেদীনকে হত্যা করতে চাইলে জয়নাব বিনতে আলীর প্রচেষ্টায় কমান্ডার উমার ইবনে সাদ তাঁকে জীবিত রাখেন।
এর পর থেকে আশুড়া এক বিষাদের ঘটনা হিসেবে মুসলমানদের নিকট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। সকল প্রকার অন্যায় আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় আশুড়া।
এজিদের অনুসারী ও ভাবশিষ্যরা আজও ইসলামের বিরুদ্ধে সক্রিয়। আশুড়া হয়ে উঠুক জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের ঐক্যের প্রতীক।

লেখক – কবি, ভাবুক ও সুফি জ্ঞানী।

শিক্ষা বিভাগের আরো খবর

আরও খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর